পিতা-মাতার মৃত্যুতে সন্তানের দায়িত্ব: কুরআন ও হাদীসের আলোকে
পিতা-মাতা পৃথিবীতে আল্লাহর দেওয়া সবচেয়ে বড় নিয়ামত। তাঁদের জীবদ্দশায় যেমন সন্তানের দায়িত্ব হয় তাঁদের খেদমত ও আনুগত্য করা, তেমনি মৃত্যুর পরও ইসলামে সন্তানদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নির্ধারিত হয়েছে। অনেকেই ভুল ধারণা পোষণ করেন যে, মা-বাবা মারা গেলে দায়িত্ব শেষ! বরং ইসলামের আলোকে মৃত্যু-পরবর্তী দায়িত্বও চিরস্থায়ী উপকারের মাধ্যম হতে পারে তাদের জন্য।
১. মৃত মা-বাবার জন্য দোয়া করা (সর্বপ্রথম দায়িত্ব)
📖 কুরআন:
وَقُل رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
উচ্চারণ: Wa qul rabbirḥamhumā kamā rabbayānī ṣaghīrā
অনুবাদ: “বল, হে আমার রব! আপনি তাদের (পিতা-মাতা) প্রতি দয়া করুন, যেভাবে তারা ছোটবেলায় আমাকে লালন-পালন করেছেন।”
(সূরা আল-ইসরা, ১৭:২৪)
➡️ মা-বাবা জীবিত থাকুক বা না থাকুক, এই দোয়াটি তাদের জন্য পড়া উচিত এবং এটি তাদের প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের প্রকাশ।
২. মা-বাবার জন্য ইস্তিগফার করা (ক্ষমা প্রার্থনা)
📖 কুরআন:
رَّبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ
উচ্চারণ: Rabbana ighfir lī wa li-wālidayya wa lil-mu’minīn
অনুবাদ: “হে আমাদের রব! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং মুমিনদেরকে ক্ষমা করুন।”
(সূরা ইবরাহীম, ১৪:৪১)
➡️ আল্লাহর কাছে নিয়মিত দোয়া ও মাগফিরাত চাওয়া সন্তানদের দায়িত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
৩. সদকায়ে জারিয়া বা নেক কাজের ব্যবস্থা করা
📜 হাদীস:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"যখন মানুষ মারা যায়, তখন তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়, তিনটি ছাড়া— (১) সদকায়ে জারিয়া, (২) এমন জ্ঞান যা থেকে উপকার পাওয়া যায়, (৩) নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।"
(সহিহ মুসলিম: ১৬৩১)
➡️ সন্তানের উচিত, মা-বাবার নামে সদকা, মসজিদ নির্মাণ, কুরআন বিতরণ, পানির ব্যবস্থা ইত্যাদি করে তাদের জন্য সদকায়ে জারিয়ার ব্যবস্থা করা।
৪. মা-বাবার প্রতিশ্রুতি ও মানত পূরণ করা
📜 হাদীস:
এক ব্যক্তি রাসূল ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করলেন: “আমার পিতা মারা গেছেন এবং তিনি মানত করেছিলেন কিন্তু তা পূর্ণ করেননি। আমি কি তা পূরণ করব?”
তিনি বললেন: “হ্যাঁ, তুমি তা পূরণ করো।”
(বুখারি ও মুসলিম)
➡️ মা-বাবা জীবিত অবস্থায় যেসব ধর্মীয় অঙ্গীকার করেছিলেন তা সন্তানের দ্বারা পূরণ করা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
৫. আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা (Silatur Rahm)
📜 হাদীস:
"তুমি যদি চাও, পিতা-মাতার মৃত্যুর পরও তাদের প্রতি ভালো ব্যবহার করতে, তবে তাদের বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখো।"
(আবু দাউদ: ৫১৪২)
➡️ মা-বাবার বন্ধু, আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা, তাদের খোঁজখবর নেওয়া – এটি একজন সন্তানের মর্যাদাপূর্ণ কাজ এবং মরহুম পিতা-মাতার জন্য সম্মানজনক।
৬. ঋণ ও দায়িত্ব আদায় করা
মৃত ব্যক্তির ঋণ ও গাফিলতিতে থাকলে তা আদায় করা সন্তানের দায়িত্ব।
➡️ এটা শুধু পার্থিব দায়িত্ব নয়, বরং আখিরাতের মুক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
📜 হাদীস:
"মরার পর জান্নাতে যাওয়ার জন্য শহীদও বাধাপ্রাপ্ত হয়, যদি তার ঋণ বাকি থাকে।"
(তিরমিজি: ১৫৭২)
৭. কবর জিয়ারত ও দোয়া
রাসূল ﷺ কবর জিয়ারতের অনুমতি দিয়েছেন এবং দোয়া করতে উৎসাহিত করেছেন:
📜 হাদীস:
"তোমরা কবর জিয়ারত করো, কেননা তা তোমাদেরকে আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।"
(সহিহ মুসলিম: ৯৭৬)
➡️ সন্তানের উচিত সময়মতো পিতা-মাতার কবর জিয়ারত করে তাদের জন্য দোয়া করা।
উপসংহার
ইসলামে পিতা-মাতার মর্যাদা অতুলনীয়—জীবনেও এবং মৃত্যুর পরেও। একজন প্রকৃত মুসলমানের উচিত, বাবা-মা মারা যাওয়ার পর তাদের দায়িত্বকে হালকাভাবে না নেওয়া। বরং মৃত্যুর পর তারা আমাদের দোয়া, ইস্তিগফার, সদকা ও প্রতিশ্রুতি পূরণ—এইসবের মাধ্যমে উপকৃত হতে পারেন।
আমরা যেন এই বিষয়গুলো সবসময় স্মরণ রাখি এবং মা-বাবার মৃত্যুতে তাদের প্রতি কর্তব্যবান হই। এর মাধ্যমেই আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে এগিয়ে যেতে পারি।

No comments