বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের হাতে এক মুসলিম নারী চিকিৎসকের হিজাব টেনে নামানোর দৃশ্য কোনো বিচ্ছিন্ন বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা নয়। এটি ভারতের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দম্ভ, সংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতার ভঙ্গুরতা এবং মুসলমানদের প্রতি দীর্ঘদিনের বৈরী মানসিকতার এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। সরকারি মঞ্চে, ক্যামেরার সামনে একজন মুসলিম নারীকে তার ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য অপমান করার এই ঘটনা ভারতের গণতান্ত্রিক দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
রাষ্ট্র যখন ব্যক্তিগত মর্যাদার শত্রু
একজন মুখ্যমন্ত্রীর কাজ নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা—কারও পোশাক খুলে দেওয়ার অধিকার তার নেই। ওই নারী চিকিৎসকের হিজাব টেনে নামানো ছিল স্পষ্টভাবে একজন নাগরিকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, ধর্মীয় বিশ্বাস ও নারীর মর্যাদার ওপর রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ। এই আচরণ দেখিয়ে দিয়েছে, ভারতে সংখ্যালঘু হলেই রাষ্ট্রের মঞ্চেও সম্মান অনিশ্চিত।
‘ভুল’ নয়, এটি একটি মানসিকতা
ঘটনার পর এটিকে “পিতৃসুলভ আচরণ” বা “ভুল বোঝাবুঝি” বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা আরও ভয়ংকর বার্তা দেয়। এতে স্পষ্ট হয়—সমস্যাটি কোনো ব্যক্তির হাত ফসকে যাওয়া আচরণ নয়; এটি এমন এক মানসিকতার প্রতিফলন, যেখানে মুসলমানদের ধর্মীয় পরিচয়কে অবাঞ্ছিত মনে করা হয় এবং নারীর সম্মতিকে গুরুত্বহীন ধরে নেওয়া হয়।
মুসলমানদের জন্য রাষ্ট্রের বার্তা
এই ঘটনার মাধ্যমে ভারতের মুসলমানদের কাছে রাষ্ট্রের বার্তাটি পরিষ্কার—তোমাদের পরিচয়, পোশাক ও বিশ্বাস সবই প্রশ্নবিদ্ধ। একজন চিকিৎসক, যিনি রাষ্ট্রের সেবায় যুক্ত হচ্ছিলেন, তাকেই রাষ্ট্র অপমান করল। তাহলে সাধারণ মুসলমান নাগরিকের নিরাপত্তা ও মর্যাদা কোথায় দাঁড়ায়—এই প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্র এখনো দেয়নি।
দ্বিচারিতা ও ভণ্ডামির আন্তর্জাতিক রাজনীতি
সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো—যে ভারত নিজের দেশে মুসলমানসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর বৈষম্য, নিপীড়ন ও অধিকার হরণের অভিযোগে নিয়মিত আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়ে, সেই ভারতই প্রতিবেশী বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ তুলে প্রায়ই উচ্চকণ্ঠে কথা বলে।
নিজের ঘরে আগুন জ্বলতে রেখে অন্যের ঘরে ধোঁয়া খোঁজার এই প্রবণতা অনেকটাই প্রবাদপ্রতিম—ভুতের মুখে রাম নাম। যে রাষ্ট্র নিজ দেশে সংখ্যালঘু নারীর হিজাব পর্যন্ত নিরাপদ রাখতে পারে না, তার কাছ থেকে অন্য দেশের মানবাধিকার নিয়ে নৈতিক বক্তৃতা শোনা নিছক রাজনৈতিক ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছু নয়।
বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, ধারাবাহিক বাস্তবতা
বিহারের এই ঘটনা কোনো একক ব্যতিক্রম নয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চাকরি, আবাসন, নাগরিকত্ব ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব—সব ক্ষেত্রেই ভারতের মুসলমানরা দীর্ঘদিন ধরে কাঠামোগত বৈষম্যের মুখে। হিজাব, দাড়ি বা মুসলিম নাম আজ রাষ্ট্র ও সমাজের চোখে সন্দেহের প্রতীক হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতায় মুখ্যমন্ত্রীর আচরণ সেই ধারাবাহিক বৈষম্যেরই প্রতিফলন।
নীরবতা মানেই অপরাধে অংশীদারিত্ব
এখনো পর্যন্ত এই ঘটনায় স্পষ্ট ক্ষমা, দায় স্বীকার বা জবাবদিহি দেখা যায়নি। এই নীরবতা বিপজ্জনক। কারণ রাষ্ট্র যখন সংখ্যালঘু অপমানের ঘটনায় নীরব থাকে, তখন সেই নীরবতাই নিপীড়নের অনুমোদন হয়ে ওঠে।
শেষ কথা
বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর হিজাব টানার ঘটনা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা ও মানবাধিকারের দাবিকে শুধু প্রশ্নবিদ্ধ করেনি, বরং তা ভেঙে দিয়েছে। সংখ্যালঘু নির্যাতনের দায় এড়িয়ে অন্য দেশের মানবাধিকার নিয়ে কথা বলার আগে ভারতের উচিত নিজের আয়নায় তাকানো। অন্যথায় এই ভণ্ডামির রাজনীতি ভারতের গণতান্ত্রিক ভিত্তিকেই আরও দুর্বল করে দেবে।
No comments