Header Ads

Header ADS

জুলুমের ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, ভালোবাসার মর্যাদা চিরন্তন


ইতিহাস কখনো তাড়াহুড়া করে রায় দেয় না। সে সময় নেয়, প্রজন্ম নেয়, রক্ত নেয়, কান্না নেয়—তারপর নিঃশব্দে তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়। ক্ষমতার মঞ্চে দাঁড়িয়ে যারা নিজেদের অজেয় ভাবে, ইতিহাস তাদের সবচেয়ে নির্মমভাবে শিক্ষা দেয়। আর যারা ক্ষমতার বাইরে থেকেও মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়, ইতিহাস তাদের কবরের উপর দিয়েই বিজয়ের মিছিল চালায়।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জুলাই অভ্যুত্থান এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র জনাব ওসমান হাদির জীবন ও মৃত্যু আমাদের সামনে সেই চিরন্তন সত্যটিকেই নতুন করে হাজির করেছে। একদিকে রাষ্ট্রীয় জুলুম, গুলি ও নিপীড়নের মধ্য দিয়ে একজন তরুণ নেতৃত্বের শহীদ হয়ে ওঠা; অন্যদিকে ইতিহাসের দুই ক্ষমতাধর শাসকের করুণ, লজ্জাজনক ও ঘৃণাভরা বিদায়—এই তুলনাই বলে দেয়, ক্ষমতা আর সম্মান এক জিনিস নয়।

রাজপথ থেকে ইতিহাসে

ওসমান হাদি কোনো রাজপরিবারের উত্তরাধিকার ছিলেন না। তাঁর রাজনীতি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া নয়, বরং সংগ্রামের ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠা। তিনি এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধি ছিলেন, যারা ভয় পেরিয়ে কথা বলতে শিখেছিল। যাদের কাছে রাজনীতি মানে সুবিধা নয়, দায়িত্ব; ক্ষমতা নয়, প্রতিবাদ।

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে তাঁর উত্থান হঠাৎ ছিল না। এটি ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, বঞ্চনা ও অপমানের স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ। যখন রাষ্ট্রীয় ভাষ্য একতরফা হয়ে ওঠে, যখন ভিন্নমত মানেই দেশদ্রোহিতা, যখন ভোটাধিকার একটি আনুষ্ঠানিক প্রহসনে পরিণত হয়—ঠিক তখনই ওসমান হাদির মতো কণ্ঠগুলো মানুষের শেষ আশ্রয় হয়ে ওঠে।

তিনি জানতেন, এই পথে ঝুঁকি আছে। তিনি জানতেন, ক্ষমতার চোখে তিনি অপরাধী। তবুও তিনি থামেননি। কারণ তিনি বুঝেছিলেন—নীরবতা কখনো নিরাপত্তা নয়, নীরবতাই সবচেয়ে বড় অপরাধ।

গুলির ভাষা ও রাষ্ট্রের চরিত্র

যে রাষ্ট্র যুক্তির জবাব গুলি দিয়ে দেয়, সে রাষ্ট্র তার নৈতিক বৈধতা হারায়। ওসমান হাদির শরীরে যে গুলি ঢুকেছিল, তা কেবল একজন মানুষকে আঘাত করেনি—তা আঘাত করেছিল রাষ্ট্রের চরিত্রকে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু প্রমাণ করে, এই রাষ্ট্র বিরোধী কণ্ঠকে শুধু থামাতে নয়, মুছে ফেলতে চেয়েছিল।

কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—গুলির মাধ্যমে কোনো আদর্শকে হত্যা করা যায় না। বরং গুলি অনেক সময় একজন মানুষকে প্রতীকে পরিণত করে। ওসমান হাদির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তাঁর মৃত্যু তাঁকে আরও বড় করে তুলেছে—একজন শহীদ হিসেবে, একজন নৈতিক মানদণ্ড হিসেবে।

ভালোবাসার বিদায়

ওসমান হাদির জানাজায় মানুষের ঢল ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। সেখানে কোনো সরকারি ঘোষণা ছিল না, ছিল না কোনো প্রশাসনিক নির্দেশ। মানুষ এসেছিল নিজের তাগিদে। কেউ এসেছিল চোখের পানি নিয়ে, কেউ এসেছিল ক্ষোভ নিয়ে, কেউ এসেছিল দোয়া নিয়ে।

এই ভালোবাসা কেন? কারণ মানুষ বুঝেছিল—এই লোকটি তাদের জন্য দাঁড়িয়েছিল। এই লোকটি সুবিধা নেয়নি, বরং ঝুঁকি নিয়েছিল। এই লোকটি আপস করেনি, মাথা নোয়ায়নি।

একজন মানুষের জানাজায় মানুষের উপস্থিতি আসলে তাঁর জীবনের সার্টিফিকেট। ওসমান হাদির সেই সার্টিফিকেটে রাষ্ট্রের কোনো সিল নেই—আছে মানুষের স্বাক্ষর।

প্রথম সৈরাচারের করুণ বিদায়

বাংলার ইতিহাসে প্রথম সৈরাচার ক্ষমতার শীর্ষে বসে নিজেকে ইতিহাসের মালিক ভাবতেন। রাষ্ট্র, বাহিনী, আইন—সবই ছিল তাঁর নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু মৃত্যুর দিন ইতিহাস তাঁকে চিনে নিয়েছিল।

তাঁর জানাজায় লোক হয়েছিল হাতে গোনা। ক্ষমতা ছিল, কিন্তু সম্মান ছিল না। রাষ্ট্র ছিল, কিন্তু মানুষ ছিল না। এমনকি কাফনের কাপড় জোটেনি—এই ঘটনা কোনো কাকতাল নয়, এটি ইতিহাসের প্রতীকী রায়।

যিনি মানুষের ভালোবাসা হারান, তিনি মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মধ্যেও অনাথ হয়ে যান। তিনি ছিলেন শেখ মুজিব। 

এরপর আসে আরেক অধ্যায়—হাসিনা। যিনি ক্ষমতাকে স্থায়ী করতে রাষ্ট্রকেই নিজের দলের শাখায় পরিণত করেছিলেন। যিনি গুম, খুন, জেল, আয়নাঘর, ভোটচুরি—সবকিছুকে শাসনপদ্ধতির অংশ বানিয়েছিলেন।

তিনি ভেবেছিলেন, ক্ষমতা মানেই নিরাপত্তা। তিনি ভুলে গিয়েছিলেন—ক্ষমতা যত বড় হয়, পতন তত লজ্জার হয়।

শেষ পর্যন্ত তাঁকেও পালাতে হয়েছে। কোনো বিদায় ভাষণ নেই, কোনো সম্মানজনক প্রস্থান নেই। পালাতে হয়েছে জ্ঞাতিগোষ্ঠীসহ। ইতিহাসে এর চেয়ে করুণ বিদায় আর কী হতে পারে?

মানুষ তাঁর জন্য কাঁদেনি। বরং মানুষ স্বস্তি পেয়েছে। এই স্বস্তিই বলে দেয়—তিনি ক্ষমতায় ছিলেন, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে ছিলেন না।

আল্লাহর আদালত ও ইতিহাসের রায়

ক্ষমতার আদালত মানুষ বানায়। আল্লাহর আদালত বানায় ইতিহাস। সেখানে কোনো বাহিনী কাজ করে না, কাজ করে আমল। সেখানে কোনো মিডিয়া নেই, আছে নিয়ত। সেখানে কোনো প্রচারণা নেই, আছে ন্যায়।

ওসমান হাদির ক্ষেত্রে আমরা দেখি—সৈরতন্ত্র তাঁকে অপরাধী বানাতে চেয়েছিল, কিন্তু আল্লাহ তাঁকে শহীদের মর্যাদা দিয়েছেন। আর দুই সৈরাচারের ক্ষেত্রে দেখি—রাষ্ট্র তাদের মহান বানাতে চেয়েছিল, কিন্তু আল্লাহ তাদের বিদায় দিয়েছেন ঘৃণা ও লজ্জার মধ্যে দিয়ে।

এটাই আল্লাহর মহিমা। এটাই ইতিহাসের ন্যায়বিচার।

ক্ষমতা বনাম সম্মান

এই দেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো—ক্ষমতা মানেই সম্মান। বাস্তবে ক্ষমতা আর সম্মান দুই বিপরীত জিনিস। ক্ষমতা চাপিয়ে দেওয়া যায়, সম্মান অর্জন করতে হয়। ক্ষমতা বন্দুকের নলে আসে, সম্মান আসে ত্যাগে।

ওসমান হাদির কাছে ক্ষমতা ছিল না, কিন্তু সম্মান ছিল। আর সৈরাচারদের কাছে ক্ষমতা ছিল, কিন্তু সম্মান ছিল না। শেষ পর্যন্ত ইতিহাস কোনটিকে বেছে নিয়েছে—তা আজ পরিষ্কার।

শেষ কথা

জোর-জুলুম করে ক্ষমতা কিছুদিন ধরে রাখা যায়। কিন্তু তা কখনো চিরস্থায়ী হয় না। আর মানুষের ভালোবাসা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে কোনো জুলুম লাগে না—লাগে সাহস, সততা ও আত্মত্যাগ।

ওসমান হাদি চলে গেছেন, কিন্তু হারিয়ে যাননি। তিনি ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছেন। আর যারা তাঁকে থামাতে চেয়েছিল, তাদের নাম ইতিহাস উচ্চারণ করবে ঘৃণার সঙ্গে।

শেষ পর্যন্ত মানুষই ইতিহাস লেখে।

আর আল্লাহ সেই ইতিহাসে চূড়ান্ত সিল মেরে দেন।

পরবর্তী ক্ষমতার জন্য এটি একটি শিক্ষা!


No comments

Powered by Blogger.