Header Ads

Header ADS

আল-কুরআন: আল্লাহ প্রদত্ত, মানবতার জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ, সত্য, ন্যায় ও হেদায়াতের চিরন্তন সংবিধান।

 


সম্পাদকীয় | ইসলামী সংবাদ

মানব ইতিহাসের দীর্ঘ পথচলায় অসংখ্য গ্রন্থ রচিত হয়েছে—কিছু জ্ঞান দিয়েছে, কিছু সভ্যতা গড়েছে, আবার কিছু সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেছে। কিন্তু একটি গ্রন্থ রয়েছে, যা অবতীর্ণ হওয়ার দেড় হাজার বছর পরও একইভাবে প্রাসঙ্গিক, একইভাবে সংরক্ষিত, একইভাবে পথনির্দেশক—তা হলো আল-কুরআনুল কারীম।

কুরআন কোনো মানুষের লেখা নয়, কোনো দার্শনিকের চিন্তার ফল নয়; এটি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ চূড়ান্ত ও সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ, যা সমগ্র মানবজাতির জন্য হেদায়াত ও রহমত হিসেবে নাজিল করা হয়েছে। আজকের এই সম্পাদকীয়তে আমরা কুরআনের ঐশী উৎস, শ্রেষ্ঠত্ব ও মানবজীবনে এর অপরিসীম গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করতে চাই।

কুরআনের উৎস: আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ বাণী

ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী কুরআন সরাসরি আল্লাহ তায়ালার বাণী। আল্লাহ বলেন:

“এটি সেই গ্রন্থ, যাতে কোনো সন্দেহ নেই; মুত্তাকীদের জন্য এটি হেদায়াত।”
— (সূরা বাকারা: ২)

হজরত মুহাম্মদ ﷺ কুরআনের রচয়িতা নন; তিনি ছিলেন কেবল বার্তাবাহক। ওহির মাধ্যমে জিবরাইল (আ.)-এর মারফত ২৩ বছরে ধাপে ধাপে কুরআন নাজিল হয়। এর প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি আয়াত আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত—এতে কোনো মানুষের হস্তক্ষেপ নেই।

কুরআনের সংরক্ষণ: অতুলনীয় এক অলৌকিকতা

বিশ্বের অন্য কোনো গ্রন্থ আজ পর্যন্ত এমনভাবে সংরক্ষিত হয়নি, যেমনভাবে কুরআন সংরক্ষিত হয়েছে। আল্লাহ নিজেই কুরআনের হেফাজতের দায়িত্ব নিয়েছেন:

“নিশ্চয়ই আমিই এই উপদেশগ্রন্থ (কুরআন) নাজিল করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষণকারী।”
— (সূরা হিজর: ৯)

আজও বিশ্বের কোটি কোটি হাফেজ কুরআন মুখস্থ রেখেছেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও কুরআনের একটি হরফও পরিবর্তিত হয়নি—এটি মানব ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা, যা কুরআনের ঐশী উৎসের সুস্পষ্ট প্রমাণ।

কুরআনের বিষয়বস্তু: জীবনের পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা

কুরআন কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা যুগের জন্য সীমাবদ্ধ গ্রন্থ নয়। এটি—

আকিদা ও বিশ্বাসের দিকনির্দেশনা দেয়

নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনের শিক্ষা দেয়

ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ পরিচালনার নীতিমালা দেয়

ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার কথা বলে

রাষ্ট্র পরিচালনা ও অর্থনৈতিক ন্যায়ের মূলনীতি তুলে ধরে

আল্লাহ বলেন:

“আমি এই গ্রন্থ নাজিল করেছি সব কিছুর স্পষ্ট ব্যাখ্যা, হেদায়াত, রহমত ও সুসংবাদ হিসেবে।”
— (সূরা নাহল: ৮৯)

অর্থাৎ মানুষের দুনিয়া ও আখিরাত—উভয়ের সফলতার জন্য কুরআনই যথেষ্ট পথনির্দেশ।

সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ কেন?

কুরআনকে সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ বলা কোনো আবেগের কথা নয়; এটি বাস্তবতার ওপর প্রতিষ্ঠিত।

১. উৎসের দিক থেকে শ্রেষ্ঠ

কারণ এটি সরাসরি আল্লাহর বাণী।

২. সংরক্ষণের দিক থেকে শ্রেষ্ঠ

একটি শব্দও পরিবর্তন হয়নি।

৩. বিষয়বস্তুর দিক থেকে শ্রেষ্ঠ

ইবাদত থেকে রাষ্ট্রনীতি—সবকিছুর দিকনির্দেশনা রয়েছে।

৪. প্রভাবের দিক থেকে শ্রেষ্ঠ

কুরআন এমন মানুষ তৈরি করেছে, যারা অন্ধকার সমাজ থেকে আলোকিত সভ্যতা গড়ে তুলেছে।

৫. চ্যালেঞ্জের দিক থেকে শ্রেষ্ঠ

কুরআন নিজেই মানবজাতিকে চ্যালেঞ্জ করেছে:

“যদি তোমরা সন্দেহ করো, তবে এর মতো একটি সূরা নিয়ে এসো।”
— (সূরা বাকারা: ২৩)

আজ পর্যন্ত কেউ সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারেনি।

আধুনিক যুগ ও কুরআনের প্রাসঙ্গিকতা

অনেকে মনে করেন, কুরআন কেবল অতীতের গ্রন্থ। বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আধুনিক যুগের—

নৈতিক সংকট

পরিবার ভাঙনের সমস্যা

সামাজিক অবক্ষয়

অন্যায়, জুলুম ও বৈষম্য

সব সমস্যার মূল কারণ হলো—কুরআনের শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাওয়া। আজ মানুষ আইন বানাচ্ছে, কিন্তু ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না; প্রযুক্তি বাড়ছে, কিন্তু মানবিকতা কমছে। কুরআনই পারে এই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে।

মুসলমানদের দায়িত্ব: কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন

দুঃখজনক হলেও সত্য—অনেক মুসলমান আজ কুরআনকে কেবল তিলাওয়াত বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছে। কুরআনের প্রকৃত দাবি হলো—

বুঝে পড়া

জীবনে বাস্তবায়ন করা

সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রয়োগ করা

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে ব্যক্তি, যে কুরআন শেখে ও শেখায়।”
— (বুখারি)

কুরআনের সঙ্গে সম্পর্কহীন ইসলাম কেবল নামমাত্র ইসলামে পরিণত হয়।

উপসংহার: কুরআনই মুক্তির একমাত্র পথ

আল-কুরআন শুধু মুসলমানদের জন্য নয়; এটি সমগ্র মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব পর্যায়ে শান্তি, ন্যায় ও কল্যাণের একমাত্র নির্ভরযোগ্য পথনির্দেশক হলো কুরআন।

আজকের এই সংকটময় বিশ্বে মানবতার প্রকৃত মুক্তি আসবে কেবল তখনই, যখন মানুষ আবার আল্লাহ প্রদত্ত এই গ্রন্থের দিকে ফিরে আসবে।

আসুন, আমরা কুরআনের মর্যাদা কেবল মুখে নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা করি। এটিই হবে আমাদের দুনিয়ার শান্তি ও আখিরাতের সফলতার একমাত্র গ্যারান্টি।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে কুরআন বুঝে পড়ার, মানার ও প্রচার করার তাওফিক দিন। আমিন।

No comments

Powered by Blogger.