ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিতদের সীমাবদ্ধতা ও জাতি গঠনে তাদের পুনঃঅবস্থান প্রয়োজন
ইসলাম কেবল ধর্মীয় ইবাদতের বিষয় নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। কিন্তু বর্তমান সময়ে ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিতদের একটি বড় অংশ কেবল মসজিদ, মাদ্রাসা বা ওয়াজ-মাহফিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। তারা ধর্মকে ব্যক্তিগত পরিসরে আবদ্ধ রেখেছে; অথচ ইসলাম চায় সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতিতেও আল্লাহর বিধান কার্যকর হোক।
এই বিচ্ছিন্নতার কারণে ইসলামী শিক্ষিতদের প্রভাব আজ রাষ্ট্র ও সমাজে নেই। ফলে নীতি-নির্ধারণ, অর্থনীতি, প্রশাসন ও প্রযুক্তিতে ইসলামি চিন্তার প্রতিফলন দেখা যায় না।
মসজিদ-মাদ্রাসার সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবতার বিচ্ছিন্নতা: আজকের দিনে ইসলামী শিক্ষিতদের অনেকেই কেবল মসজিদে ইমামতি, মাদ্রাসায় শিক্ষকতা বা মাহফিলে বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এতে তারা সমাজের মূলধারার অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক শক্তি থেকে দূরে থেকে যাচ্ছে।
যে সমাজে নীতি নির্ধারণ করে অর্থনীতিবিদ, প্রযুক্তিবিদ ও প্রশাসকরা— সেখানে ইসলামী শিক্ষিতরা যদি অনুপস্থিত থাকে, ইসলাম সেখানে পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।
ইসলাম প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন বহুমাত্রিক মুসলমান: ইসলামের ইতিহাসে আমরা দেখি— ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ব্যবসায়ী, বিজ্ঞানী, সৈনিক, প্রশাসক ও কৌশলবিদদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। নবী করিম ﷺ ছিলেন একজন দক্ষ বণিক, খলিফা উমর (রা.) ছিলেন প্রশাসনের উদাহরণ।
আজকের যুগে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য দরকার গবেষক মুসলমান, বিজ্ঞানী মুসলমান, ডাক্তার মুসলমান, ইঞ্জিনিয়ার মুসলমান ও প্রশাসনিক মুসলমান। কেবল তাবলীগ বা ওয়াজ-মাহফিলের মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
মূলধারার বাইরে ইসলামী শিক্ষিতদের অনুপস্থিতি: বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বের বহু দেশে ইসলামী শিক্ষিতরা সরকারি প্রশাসন, ব্যাংক, ব্যবসা, বিশ্ববিদ্যালয় ও কূটনীতিতে খুব কম সংখ্যায় রয়েছে।
ফলে নীতিনির্ধারণ হচ্ছে ইসলামবিমুখ দৃষ্টিকোণ থেকে, যা সমাজে নৈতিক অবক্ষয়, দুর্নীতি ও স্বার্থান্ধতা বাড়াচ্ছে। ইসলামী শিক্ষিতরা যদি এই জায়গাগুলোতে প্রবেশ করতে পারতেন, রাষ্ট্রের নৈতিক দিকটি শক্তিশালী হতো।
ইসলামী সংগঠন :
শিক্ষা ও আদর্শ গঠনের সফল মডেল
বাংলাদেশে ইসলামী চিন্তাকে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে কিছু ইসলামী সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। তারা আধুনিক শিক্ষা ও ইসলামী আদর্শের সমন্বয়ে নেতৃত্ব তৈরি করছে।
তাদের প্রচেষ্টার ফলে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, গবেষক ও শিক্ষক শ্রেণির মধ্যে ইসলামি চেতনা বাড়ছে। এই ধারার প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহযোগিতা করা মানে দেশের নৈতিক ভিত্তি ও সার্বভৌমত্ব শক্তিশালী করা।
বিজ্ঞান, গবেষণা ও প্রশাসনে ইসলামের উপস্থিতির প্রয়োজন: কুরআনে বারবার বলা হয়েছে— “তোমরা কি চিন্তা করো না?”, “তোমরা কি জ্ঞান অর্জন করো না?”
এটি প্রমাণ করে, ইসলাম জ্ঞান ও গবেষণাকে উৎসাহিত করে।
যদি মুসলমানরা বিজ্ঞান, অর্থনীতি ও প্রশাসনে পিছিয়ে থাকে, তবে ইসলামকে আদর্শ জীবনব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। তাই ইসলামী শিক্ষিতদের এসব খাতে প্রবেশ করা অপরিহার্য।
ইসলামী শিক্ষার কাঠামোতে সংস্কার দরকার: বর্তমান মাদ্রাসা শিক্ষাকে এমনভাবে উন্নত করতে হবে, যাতে ছাত্ররা শুধু হাদীস বা ফিকহ নয়, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতেও দক্ষতা অর্জন করে।
দ্বীনি শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বিত পাঠ্যক্রম তৈরি করলেই ইসলামী শিক্ষিতরা রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ নিতে পারবে।
ইসলামি নেতৃত্বের অভাবে জাতীয় ক্ষতি: যখন রাষ্ট্রে ইসলামি নেতৃত্ব অনুপস্থিত থাকে, তখন সিদ্ধান্ত হয় ক্ষমতাবানদের স্বার্থে, ন্যায়ের ভিত্তিতে নয়। এর ফলেই বাড়ে দুর্নীতি, অন্যায় ও অবিচার।
ইসলামী শিক্ষিতদের রাজনীতি, প্রশাসন ও অর্থনীতিতে যুক্ত করা গেলে নৈতিক নেতৃত্ব গড়ে উঠবে, রাষ্ট্রে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা পাবে।
সহযোগিতা ও সামাজিক দায়িত্ব: ইসলামী আন্দোলন, ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গবেষণাকেন্দ্র বা সংগঠন বা এই ধরনের প্রতিষ্ঠানকে সহযোগিতা করা সময়ের দাবি।
তাদের সহযোগিতা মানে একটি আদর্শিক, সৎ ও শিক্ষিত সমাজ গঠনে অবদান রাখা। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও শান্তি রক্ষায় ইসলামী আদর্শই হতে পারে মূল ভিত্তি।
উপসংহার
ইসলাম প্রতিষ্ঠা কেবল বক্তৃতা বা ওয়াজে সম্ভব নয়; এটি সম্ভব বাস্তব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অংশগ্রহণের মাধ্যমে।
আমাদের দরকার এমন মুসলমান, যারা মসজিদে ইমামতি করতে পারেন, আবার গবেষণাগারেও কাজ করতে পারেন; যারা নামাজে দাঁড়ান, আবার নীতিনির্ধারণ টেবিলেও ইসলামি দৃষ্টিকোণ তুলে ধরেন।
ইসলামী শিক্ষার সাথে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রশাসনিক জ্ঞান একত্রিত হলে মুসলমানরা আবারও বিশ্ব নেতৃত্বে ফিরে আসবে।

No comments